বৃহস্পতিবার, ৬ অক্টোবর, ২০১১

আটজন স্বপ্নভূক কবির কবিতা নিয়ে পাঠপ্রতিক্রিয়াধর্মী কথাবার্তা / সাম্য রাইয়ান

বোধ করি, কবিদের েেত্র একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল, তাঁরা মানুষের শ্বাস-প্রশ্বাসের শব্দ শুনতে পান। শুকনো পাতা ভেঙে চুরমার হচ্ছে -এর শব্দ শুধুমাত্র কবির পইে শোনা সম্ভব। এর ফলে স্বাভাবিক কারণেই কবির সাথে পার্থক্য তৈরি হয় সাধারণ মানুষের।

পেটো কথিত ‘আদর্শ রাষ্ট্রে’ কবিদের বাস
নিষিদ্ধ হয়েছে বহু আগেই;
যদিও সেই ‘আদর্শ রাষ্ট্রে’ কবিরা বাস করতে আদৌ ইচ্ছুক কি না তা প্রশ্নসাপে ব্যাপার

যে কবি রাজনীতি বোঝেন না, তার কবিতা শেষপর্যন্ত আমি-তুমি মার্কা হালকা প্রেম-ভালোবাসার স্তরেই থেকে যাবে। সমাজ-রাষ্ট্র তার অধরাই থেকে যাবে। এধরনের চর্চা বাঙলাদেশে প্রচুর হয়েছেÑ এখনও হচ্ছে। আবার অনেক কবি সুযোগসন্ধানী আচরণ করছেন; বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলের গোলামী করছেন। (যদিও তাদের ‘কবি’ বলা উচিত কি না তা প্রশ্নসাপে ব্যাপার)। যেহেতু সমাজ দূষিত হলে শিশুর দুধের ওপরও তার প্রভাব পড়ে, তাই কবিতা নিয়ে এরকম ধান্দাবাজির প্রভাব কুড়িগ্রামেও পড়েছে, যা এখনও কারো কারো চর্চার মধ্য দিয়ে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রেখেছে। কেউ বুর্জোয়া গণ(?)মাধ্যমে নায়িকার দু’পায়ের ফাঁকে এক-আধখানা চরণ ছাপিয়ে নিজেকে কুড়িগ্রামের প্রধান কবি ভাবতে শুরু করেন, আবার কেউ ‘টিকে থাকার জন্য’ মতাসীন দলের আব্বা-স্বামী-চাচা-ভাই-মামা অমুক-তমুকের নামে সাহিত্য-সংস্কৃতির দোকান খুলে বসেন। কিন্তু আনন্দের বিষয় এই যে, এইসব ধান্দাবাজির বাইরেও অনেকে কবিতা চর্চা করছেন; নিজের কাব্যজগত নির্মাণে মগ্ন রয়েছেন। মূলত তাঁদের কয়েকজনের প্রতি নজর দেয়াই এই পাঠপ্রতিক্রিয়াধর্মী লেখার মূল উদ্দেশ্য। (আরো কঠোর হলে হয়ত’ এখান থেকেও কিছু নাম বাদ যেত!) পাঠক, চলুন শুরু করা যাক.....

তারিফ উল হক শুভ্র সরখেল রাশেদুন্নবী সবুজ নুরে আলম দুর্জয় জ্যোতি আহমদ মাইকেল রবিন সরকার ইউসুফ আলমগীর হেলাল জাহাঙ্গীর

নতুন দিনের স্বপ্নে বিভোর এক তরুণ কবি তারিফ উল হক। ব্যক্তিগত আশা-আকাঙ্খা, চাওয়া-পাওয়াই তাঁর অধিকাংশ কবিতার বিষয়বস্তু। কবিতায় মার্কসবাদী চিন্তার ছাপ পাওয়া যায়। মুক্তির চেতনা প্রায় কবিতাতেই স্পষ্ট।

আজীবন নমস্য মিথ্যাকে মৃত্যুর আগে একবার লাথি মারা / আমার জীবনের শেষ ইচ্ছা। / অন্যভাবে যদি বলি / সাত জন্মের পাপের সাী হৃদয় শিরা-উপশিরা। / বেঁচে থাকার জন্য আজি বেঁচে দিয়েছি সব, / গরিবের ঈশ্বরও গরিব / তাই চাওয়াগুলো ভীষণ ুদ্রতায় / ঠিক চাওয়া হয়ে ওঠে না।
(তারিফ উল হক \ স্মীকারোক্তি \ প্রচ্ছদ সাহিত্যপত্র-২ \ বৈশাখ ১৪১৬ ব.)

বি ডি আর বিদ্রোহের মতো গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারকে কবিতায় তুলে আনার কাজও তিনি করেছেন-

আমাদের যখন নির্যাতন করা হতো / আমাদের শ্রমের টাকা লুট করে নিয়ে ফুর্তি করতো ওরা দিনরাত / তখন কোনো আইন ছিলো না / তখন কোনা নৈতিকতা ছিলো না / তখন কোনো মানবতাও ছিলো না / যাদের শরীরের প্রতিটি রক্তবিন্দু / আমাদের শোষণের ফল / তাদের আমরা মৃত্যুদন্ড দিয়েছি। / আমরা জানি- / আমাদের গরীবদের বিরুদ্ধেই / ওদের সকল আইন-নীতি আর / টিভি-মিডিয়ার / নোংরা মিথ্যাচার; / আমি জানি আমার পরিণতি কি / তবু লড়াইয়ের ডাক দিয়েছি। / আমাদের মরতে হবে মুক্তির জন্য / আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গ্যাছে।
(তারিফ উল হক \ ডি এ ডি তৌহিদের কথা \ শ্বেতপত্র-১)

এেেত্র আরেক তরুণ কবি শুভ্র সরখেল -এর অবস্থানও একই। যার ফলে তিনি বলেন,

জাহানারা ইমামের আন্দোলন / আর বি ডি আর সংগ্রামের পার্থক্য তো / দেখি না!
(শুভ্র সরখেল \ প্রশান্তির গালিচায় আমার কবিতা এঁকে দিও \ শ্বেতপত্র-৪ \ অক্টোবর ২০০৯ খ্রি.)

শুভ্র সরখেলের কবিতার প্রতি অনুতে ইতিহাস চেতনা থাকে সক্রিয়। গ্রিক মিথোলজির ব্যবহার কবিতায় ভিন্নমাত্র যোগ করে। তাঁর কবিতা নিরন্তর হাতুড়ির শব্দ। ...প্রতিশিল্পের জগত নির্মাণ করে চলেছেন ক্রমাগত, নিভৃতে।

আমার মানুষ হবার দীর্ঘ পথ জমা রেখে দেই / বসুন্ধরার কোলে। শেষমেষ মানুষ হবার / পুণঃপ্রচেষ্টা। / আমি ঘুম থেকে জেগে উঠি কার্ল মার্কসের অঙ্কগুলো কষে।
(শুভ্র সরখেল \ বাল্যকালের বায়োস্কোপ \ বিন্দু-১০ \ শ্রাবণ ১৪১৬ ব.)


রাশেদুন্নবী সবুজ -এর কবিতা তাঁর যাপনের সাথে একাতœ হয়। জীবনের প্রাত্যহিক কথামালাই তাঁর কবিতার ভাষা হয়ে ওঠে। তিনি তাঁর ‘লেখার ভাষা’ খুঁজে পেয়েছেন, যা খুব কম লেখকের পইে সম্ভব হয়। কখনো তিনি কবিতায় এমন কিছু দৃশ্য আমাদের দেখিয়ে দেন, যা আমরা সাধারণভাবে ল্যই করিনা! তিনি আমাদেরকে দেখিয়ে দেন, ‘কাঁদতে-কাঁদতে লাল হয়ে যাচ্ছে মাটি ও পিচ ঢালা খয়েরি সড়ক’।

আলো থেকে অন্ধকার পর্যন্ত কারফিউ / বেতারের প্রচারিত হচ্ছে সাধারণ জনপদের ঘটনা / আর শকুন আর কুকুর আর শেয়াল খেতে খেতে বমি করছে / গত দু’দিন বাইরে পা বাড়ানো যাচ্ছে না / হিমালয় শৃঙ্গে বাতাসের শো শো শব্দ শোনা যায় / ভয়ানক ঝড়ের সাথে বুলেট বৃষ্টি হচ্ছে পূর্বাভাস ভেঙে / হঠাৎ আতঙ্কিত বেড়াল গলায় কাঁটা বিঁধে কাঁশছে / মেঘের আঙিনায় ভয়, বাতাসথজোৎস্নাথজল কাঁপছে / কাঁটা তারের বেড়ার ওপাশে অপহৃত সূর্য আটকে আছে অপেক্ষায় / কাঁদতে কাঁদতে লাল হয়ে যাচ্ছে মাটি ও পিচ ঢালা খয়েরি সড়ক / নিখর্ব জোড়াজুড়ির পরও চোখ দেয় নাই এক ফোঁটা জল / শুধু তাকিয়ে ছিল পঁচা গলা নষ্ট হয়ে যাওয়া চোখের ভালোবাসা /
(রাশেদুন্নবী সবুজ \ ওরা বিশ্ব মাতুব্বরের কা-কা শব্দ শুনেছিল \ বিন্দু-১১ \ বৈশাখ ১৪১৮ ব.)

‘শামুকের ফাঁকে লুকিয়ে থাকা সমুদ্রের ফেনা’ দেখতে পাওয়া এক তরুণ কবি নুরে আলম দুর্জয়। রাশেদুন্নবী সবুজের মতো তাঁর কবিতায়ও সু কিছু ব্যাপার অত্যন্ত চমৎকারভাবে উঠে আসে-

শামুকের ফাঁকে লুকিয়ে থাকা সমুদ্রের ফেনা / তোমাকে খুঁজবে না আর কখনো / একদিন হয়তো শামুক কুড়াতে গিয়ে দেখবে / সমুদ্র থেকে বিতাড়িত সেই লেপ্টে থাকা ফেনা
(নুরে আলম দুর্জয় \ অবশেষের শেষ \ বিন্দু-১১ \ বৈশাখ ১৪১৮ ব.)

এই কবিই আমাদের অবাক করে দিয়ে বলেন,

নগরের রাস্তায় জমাটবাঁধা জলে / নিজেকে দেখে নেই আর একবার / ... / বাড়ি ফেরা উৎসবে ফেরার বদলে হাঁটতে থাকি / আমি নই শুধু / শহুরে কুকুর কাক টোকাই / আর আছে অদ্ভুত কিছু নিঃসঙ্গতা
(নুরে আলম দুর্জয় \ শহরচিত্র \ শ্বেতপত্র-৪ \ অক্টোবর ২০০৯ খ্রি.)

ব্যক্তি সর্বদাই মূখ্য হয়ে ওঠে ইউসুফ আলমগীর এর কবিতায়। আরো স্পষ্ট করে বললে, ব্যক্তির সংকট, নাগরিক টানাপোড়েন, মানসিক বিকৃতি এসবই তার কবিতার মূল স্বর। আমরা যে ধীরে ধীরে শেকড়বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছি, অন্তরের বন্ধুকে ‘ভার্চুয়াল ফ্রেন্ড’ বানিয়ে ফেলছি, এইসব বিষয় তাঁর কবিতায় উঠে এসেছে বারবার।

আমার মুখরতা-আমাদের মুখরতা / এখন জারুল আর তমালের নয় / দিগন্তজোড়া ইউক্যালিপ্টাসের সরু পাতায়... / ... / আমাকে শুষে নেয় কর্পোরেট বৃ... / ... / পাখিহীন এই বিমুখ প্রান্তরে / হায়! কিসের আয়োজন / কিসের চাষাবাদ...
(ইউসুফ আলমগীর \ আমাদের মুখরতা \ কথন ১ \ মে ২০১০ খ্রি.)

অথবা-

মুঠোফোন সঃস্কৃতিতে চিঠি আর লেখা হয় না / চিঠির বার্তা ভাসে যন্ত্রের মনিটরে / ... / কন্ট্যাক্ট লেন্সে বদলায় চোখেরও রঙ / ক্রিমের পলেস্তার ত্বকে দুপুর গড়িয়ে যায় / ফেশিয়ালের দোকানে ভিড় করে হাজার তরুণী / হায়! তুমি বুঝি সখা এখনো / সেই মুঠোসাবান আর সোডায়...
(ইউসুফ আলমগীর \ কিছু মেঘ ছায়ার শরীর \ ফেব্র“য়ারী ২০১০ খ্রি.)

পুরোদস্তুব বিপবী ঘরানার কবি হেলাল জাহাঙ্গীর। মোট দু’টি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে; জ্বলে প্রেম! জ্বলে আজন্ম বিপব!! (২০০২খ্রি:), আলোর উপরে আলো!! (২০০৫ খ্রি:)। শুরু থেকেই তার কবিতায় বিপবের আকাঙ্খা, অনুন্নত পুঁজিবাদী এই সমাজ ভেঙে বৈষম্যহীন নতুন সমাজ গড়ার আহ্বান স্পষ্ট। প্রায় অধিকাংশ কবিতাই অরবৃত্তে রচিত।

জাগো শোষিত-নির্যাতিত / সর্বহারার দল / রক্ত আলোয় জেগে ওঠো / সাম্য যুদ্ধে চল্। / ... / এসমাজ যে বুর্জোয়াদের / পুজিবাদের গড়া, / গণতন্ত্র-স্বাধীনতার / স্বাদ লোটে তাই ওরা। / ... / আমরা মরি অকালে হে / বানে-খরায়-শীতে / আমরা মরি মিছিলে হে / রাজপথে-মঙ্গাতে। / ... / সাম্য আলোয় গড়তে হবে / প্রিয় বাংলাদেশ / সকলে রবে সমঅধিকারে / বঞ্চনা হবে শেষ।
(হেলাল জাহাঙ্গীর \ সাম্য আলোয় \ প্রচ্ছদ-১ \ মার্চ ২০০৮)

রাজনৈতিক বিষয়-আশয় নিয়ে কবিতা লেখায় অসাধারণ দ কবি মাইকেল রবিন সরকার। তাঁর আজ রাশিয়ায় বৃষ্টি হচ্ছে না, অমিয়বালার প্রতœতত্ত্ব, শোক দীর্ঘায়িত হচ্ছে, যতোটা শোনা যায় -কবিতাগুলি বাঙলা সাহিত্যে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। আন্তর্জাতিক বিষয়কে কতোটা চমৎকারভাবে কবিতায় নিয়ে আসা যায়, তা তিনি দেখিয়েছেন। যদিও তার সা¤প্রতিক কবিতাগুলি সেই তুলনায় কোন গুরুত্বই বহন করে না।

রবার্ট, আপনি জানেন / পৃথ্বীখ্যাত রাজনৈতিক হত্যাকান্ডের সাথে / সি আই এ’র সম্পৃক্ততার কথা- / ফ্যামিলি জুয়েলস্ এর অদ্যোপান্ত। / তাদেরই পোষক রাষ্ট্র আমেরিকা আজ / গণতন্ত্রের মহান তান্ত্রিক সেজে কেবলই / গণঔম্ গণঔম্ করছে। / ... / রবার্ট, আপনার জানার কথা / শোষিতের শ্বাসকষ্ট চরমে পৌঁছলে / এক একটা ফিলিস্তিন হয়। / ুধার প্রতিটি স্তর তখন ভরে ওঠে অফুরন্ত শস্যে / হারানো ভূখন্ড ফিরে পেতে সদ্যজাত শিশুরা / কোন এক আবাহনী মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে / যুদ্ধের প্রস্তুতিপর্ব সারে।
(মাইকেল রবিন সরকার \ শোক দীর্ঘায়িত হচ্ছে \ উত্তরের জানালা-৩ \ আগষ্ট ২০০৭ খ্রি.)

বাঙলা ভাষার একজন গুরুত্বপূর্ণ কবি জ্যোতি আহমদ। তাঁর অধিকাংশ কবিতাই বেশ দীর্ঘ। কিন্তু মজার ব্যাপার হচ্ছে, কবিতায় তিনি এতো চমৎকারভাবে দৃশ্যকে শব্দবন্দী করেন, পড়ার সাথে সাথে পাঠকের সামনে দৃশ্য ভাসতে থাকে। তার কবিতা পড়তে পড়তে কখনোই বিরক্তি বোধ হয় না, বরং একটি লাইন পরের লাইনে যেতে উৎসাহ জোগায়। প্রায় প্রতিটি কবিতায় তিনি নিজের জগত নির্মাণ করেন। ঠিক সেরকমই দুর্দান্ত কবিতা হল, রূপনগর, আমাদের মনের কোন মঙ্গা নেই, পরশ্রীকাতর কবির দিনলিপি (সিরিজ), আত্মহত্যার মেয়েটির দ্বিধা ছিল প্রভৃতি।

কবিতার েেত্র ভাষা কখনও মূখ্য বিষয় নয়। শুধুমাত্র ভাষার জোড়ে কবিতা টিকে থাকে না। বিশ্ব কবিতা ইতিহাসে তারাই টিকে ছিলেন, যাদের নিজস্ব কাব্যজগত ছিল। এই গদ্যে উলেখিত আটজন কবিই নিজেদের কাব্যজগৎ নির্মাণে সক্রিয়। সামনে অনেক পথ; ব্যক্তিগত বোঝাপড়া (পড়াশুনা+অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠে), পরিবেশ-পরিস্থিতি আর্থসামাজিক প্রোপটই ঠিক করে দেবে- এঁরা কোন পথে যাবে।

ভিন্নরুপী / জুলকার নাইন স্বপন

শীতের সকাল। সবুজ ঘাসের বুকে রসে টইটুম্বুর শিশির বিন্দুগুলো মুক্ত দানার মতো চিক চিক করছে। আজ কুয়াশাটা একটু বেশীই। সূর্যের আলো তাই ছড়িয়ে পরতে পারেনি চারদিকে।
এমন সকালে কাঁথা মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকতে বেশ ভালোই লাগে। খুব জরুরি কোনো প্রয়োজন না থাকলে বিছানা ছাড়তে ইচ্ছা করেনা। আলীর ইচ্ছা করছিলো শুয়ে থাকতে অন্ততঃ আরো ঘন্টা খানেক। কিন্তু গরীবের জন্য এ আরাম যে হারাম, তা সে তার অল্প বয়সের অভিজ্ঞতাতেই বুঝে ফেলেছে। একদিন কাজ না করলে যার পেটে ভাত জোটে না, তার জন্য এ সুখতো সয় না।
আলী ভাবে দিনমজুরের যদি সপ্তাহে এক দিন ছুটি থাকতো, তা কি মজাটাই না হতো। ছয় দিন কাজ, সাত দিনের মজুরী, এক দিন ছুটি। অথচ খাওয়ার কোনো চিন্তা নাই। বাহ্ ! আলী মনে মনে ভাবে এমন একটা ব্যবস্থা যদি তার হতো- তাহলে এই দুনিয়ায় তার মতো সুখী বুঝি আর কেউ হতো না। এসব কথা ভাবতে ভাবতে তার তন্দ্রা এসেছিল। এসময় আলীর মা উচ্চস্বরে ডেকে ওঠে “ আলী, অই আলী” জলদি ওঠ বাবা, কামে যা। আইজ ইকটু তাড়াতাড়ি ফিরবি, বৈকালে গঞ্জে যাইবি, কেজি খানিক গুড় আনতে হইবো। কাইল জুম্মায মিলাদ দিমু। তোর কামেও যাওন লাগবো না।”

আলী মায়ের ডাকে ও কথায় ভিতরে ভিতরে বিরক্ত হয়। সে কিছুটা খেঁকিয়ে ওঠে, জিজ্ঞেসা করে- ক্যান ? কামে যাওন লগবো না ক্যান? বলেই সে কাঁথা সরিয়ে বিছানায় উঠে বসে। আলীর মা চিৎকার করে ওঠে- ক্যান, এই দিনের কতা তোর মনে থাকে না। পত্যেক বছর তরে এই দিনের কতা মনে করাইয়া দেওন লাগবো? নিজের বাপের মরনের দিনের কথা তোর মনে থাকে না ? মনে থাকে না এই দিনে পশ্চিমা মিলিটারি আর রাজাগার মিল্যা তোর তোর বাপরে গুলি কইরা মারছিল। তোর বইনের সেই দশার কতা কি তুই ভুইাল্যা গ্যাছোস? আলীর মার চিৎকার বিলাপে রুপ নেয়, সে আচঁলে মুখ ঢেকে ফুপিয়ে কেঁদে ওঠে।

আলী কোনো কথা না বলে ঘর থেকে বের হয়। উদ্ভ্রান্তের মত হাঁটতে থাকে... ঘাসের উপর শিশিরগুলোর পতন ঘটে। ধীরে ধীরে প্রখর হয়ে ওঠে সূর্যের সোনালি আলো। খোলা মাঠের বুক চিরে পথ। আলী সেই মেঠোপথ ধরে চলতে থাকে ভিন্ন এক জগতের উদ্দেশ্যে। না, না, সে মনে করতে চায় না তার বাবার মৃত্যুদিনের সেই স্মৃতি। তার বোনের ধর্ষিতা হওয়ার বেদনার কথা।

সেইদিন পশ্চিম পাকিস্থানী মিলিটারী আর রাজাকাররা হঠাৎ তাদের বাড়ি ঘেরাও করে। তারপর তারা আলীর বাবাকে গুলি করে হত্যা করে, মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার কারণে। মিলিটারীরা চলে যাওয়ার পর কয়েকজন রাজাকার প্রকাশ্যে দিবালোকে তার বোনকে ধর্ষন করে ।
আলীর বুকটা ভেঁঙ্গে খান্ খান্ হয়ে যায়, আবার মহা এক আক্রোশ দাউ দাউ করে জ্বলে ওঠে তার হৃদয়।

যদিও আলী তখন ছোট, তবু সে আনেক কিছুই বুঝতে পারতো। রাজাকাররা চলে যাওয়ার পর গ্রামের লোকেরা তার বাবাকে তাড়াতাড়ি কবর দেয়। কেউ কেউ শান্তনার বাণী শুনিয়ে সট্কে পরে।

আলী ভাবে, মুক্তিযুদ্ধ কি? ক্যান তার বাবা মুক্তিযুদ্ধে গেছিল? মুক্তিযুদ্ধে না গেলে ওরা তো তার বাবাকে খুন করতো না, আর তার বোনের ইজ্জতও যাইতো না। আলী শুধু কাঁদছিলো। লোকজন চলে গেছে। চারদিকে সুনসান । অবসন্ন আলী ঘরের ভেতরে বেহুশ হয়ে পড়ে থাকা তার মায়ের কাছে এসে বসে। ছোট্র বুকটা দুঃখে কষ্টে যেন ফেঁটে যায়। সে তার মায়ের পাশে শুয়ে পড়ে। কতণ, কতসময় গড়িয়ে চলে যায় সে বুঝতে পারে না। হঠাৎ আবার লোকজনের হট্রগোল । চমকে ওঠে আলী। আবার বুঝি মিলিটারী রাজাকাররা আসতাছে। এবার তার মা-বোন ও তাকেও বুঝি ওরা গুলি করে মারবে।

সে লাফ দিয়ে ঘরের বাইরে আসে। হায় একি ! তার বোনের লাশ ঝুলে আছে পুরোনো আম গাছের ডালে। শরমে গলায় ফাঁস দিছে। আহা বৈইন ! আলীর মনে হয় এসময় যদি তার হাতে একটা বন্দুক থাকতো, সে একাই সব মিলিটারী রাজাকারদের গুলি করে মারতো। আলী আর কাঁদে না যেন বোবা হয়ে যায়।

উৎসুক জনতা বাড়ির বাইরে ভীড় করছিলো। দুই একজন ছাড়া কারোর কাছেই আলী সমবেদনার কথা শুনলো না। অথচ কেউ কেউ ফ্সি ফ্সি করে তার বোনের যৌবন ভারা শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের রসালো বনর্না দিচ্ছিল। আনেকের চোখে সে দেখছে মাংসাসী জন্তুর ন্যায় লোলুপ দৃষ্টি। তাদের জীবগুলো যেন লক্লক করছিলো জৈবিক সুখ আস্বাদনের নেশায়। এতদিনের চেনা মানুষগুলো যেন হঠাৎ অচেনা প্রাণীতে পরিণত হয় তার কাছে। তখন আলীর অব্যক্ত কণ্ঠ ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে এক ধ্বনি “শালা তোরা কি মানুষ...না... ভিন্নরুপে ঐ রাজাকার”?

পাখিদের কলরব / নয়ন সরখেল

তুমি কি জান
পাখি কেন ডাকে?
তোমার ঘুম ভাঙাবে বলে।

তুমি কি জান
পাখিরা কেন উড়ে?
শিশুদের আনন্দ দেবে বলে।

পাখিরা সকালে ডাকে
সবার ঘুম ভাঙাবে বলে;
সবাই শোনে পাখিদের কলরব।

এভাবে আমাদের ঘুম ভাঙে
পাখিদের কলরবে

বিষাদ বিষয়ে কথকতা / এস এ পলাশ রায়

জানালা দিয়ে তাকিয়ে আজ কেন মনে হল, শরীর তাঁর পাখির মতোই। চেয়ার ছেড়ে যে কোনো মুহূর্তে যেন তিনি উড়ে যাবেন অনন্তের দিকে চারদিক এলোমেলো করে সহসা ঝাপিয়ে পড়ল বৃষ্টি। ঠান্ডার পুবের আকাশে মেঘের স্তর অনেক নিচুতে। খুব নিচ দিয়ে উড়ে যায় মেঘেরা। যেন হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যায় মেঘের শরীর। বৃষ্টি যেন মুহূর্তেই বদলে দিল পুরো সন্ধ্যার চালচিত্র; বাংলাদেশের মতো।

জ্ঞান চর্চা / নাহিদ হাসান

(২৬ আগস্ট ২০০৬ খ্রিঃ তারিখে ফুলবাড়ী শহীদদের প্রতি)

এই বাচ্চারা, লাইনে দাঁড়াও, সোজা হও এবারে শপৎ -
আমরা শপৎ করিতেছি যে, তিরিশ ল শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত
এই বাংলাদেশ রাস্ট্রের প্রতি অনুগত থাকিব এবং জীবনের বিনিময়ে হলেও
জাতীয় পতাকার মর্যাদা, স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ত রা করিব

অ্যাই শোনা, ডু নট কোয়ারল মানে ঝগড়া করো না! পড় -
দাতা সংস্থা ইউনেস্কো, বিশ্বব্যাংক প্রভৃতির নামে
কেননা, তারা আমাদের যাবতীয় শিা উপকরণ দান করেছেন
কৃতজ্ঞতা স্বীকার করো, বহুজাতিক এনজিও প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে;
যেখানে তোমাদের পিতারা চাকুরী করেন এবং মায়েদের
সব্জীরচাষ-ঋণগ্রহণ-মোটা তাজাকরণের মাধ্যমে মঙ্গাকে মঙ্গলে পাঠানোর কথা বলা হয়
ধন্যবাদ জানাও মার্কিন দূতাবাসকে; যা মার্কিন স্বর্গ ও দুনিয়ার সংযোগ সেতু
এবং আমাদের সকল ভালো-মন্দের মা-বাপ
আর কাসরুমে বসে যে রাস্তাটি দেখা যায়, যা হাজার হাজার কয়লাবাহী
ট্রাকের ভারে উল্লসিত; সেটিও উন্নয়ন সহযোগী এশিয়া এনার্জি দ্বারা প্রতিষ্ঠিত,
এতএব তাকেও ধন্যবাদ

বউ প্লাস চ্যানেল / আরাফাত রাতিন

প্রিয়তমা, ফিরে এলে স্বাগতম
স্টার প্লাস দেখে বখে গিয়েছিলে।

নয়টি বছর পেরুলো
বিছানায় তাকিয়ে বল,
তোমার বিছানা কি আমার মতো
পরিপাটি ভাবে থাকে সকালে?

খোকা কি কবিতা বোঝে?
শুনেছি মহিলা সংঘ কর
তোমার মা চাচার বুদ্ধি নেয়
তুমি নেও মারটা
বাবা থাকলে আলাদা হতাম না।

আমি তো শুধু মদ গিলি
অনেকে ঘুষ, নারী, আরও কত কী
যাকগে একটা তথ্য দিই, এখন আর মদ্যপ অবস্থায়
ড্রাইভ-এ ফাইন দিয়ে বেড়াচ্ছি না।

তোমার সংঘে কত মিটিং মিছিল
পথে নয় ফিরে এস
বাড়ির লোডশেডিং উপভোগ কর
মতা-সম্মান সব দেব
বিদ্যুৎ এলে রিমোট দেব।

নয়টি বছর...
ইদানীং খালি মনে হয়
ডিসকভারির বানরগুলো আমায় ভেঙচি কেটে চলেছে।

উপলব্ধি / ইলিয়াড

আমার মতো অচেতন মানুষকে প্রতিবন্ধী বলা যাবে না
আমিও পারি কল্পনা করতে, গবেষণা করতে
পারি অতীতকে স্মরণ করতে

আমি বোধকরি এক প্রকার লুনাটিক

জল দর্পণ / মাহমুদা রহমান

তোমাকে ভালোবাসি এটা বলবনা
তোমাকে ভালোবাসিনা তাও বলবনা,
বোধ করি তোমার জন্য অন্য এক তাড়না
একে যদি ভালোবাসা বল কিছু বলব না
কেউ না জানুক তুদি তো জানো
জলকে কেউ আয়না বলবে না

গাজর মুন্সীর দু’নম্বরি / আকরাম হোসেন

‘শোন, বাজার যাও, বাজার না করলে আজ খাবে কি?’ গাজর মুন্সীর সোজা কথা, ‘টাকা পয়সা কম, বেশী কিছু আনতে পাবো না’ ব্যাগ নিয়ে গাজর মুন্সী বাজার যায়; এটা ওটা দাম করে কিন্তু সুবিধা করতে পারে না বনে না, কি নিবে! শেষে কাঠাল বাড়ির কচু, মুলা আর মোগলবাসার বেগুন, করলা নিয়ে টাকা শেষ হয় চিন্তায় পড়ে যায় বাকী খরচ কি দিয়ে নেবে এক দোকানের বারান্দায় বসে গাজর মুন্সী একটা বিড়ি ধরায় দেদারছে টান আর ধোঁয়া ফুঁক দোকানের কর্মচারী ধমক দেয়, ‘ওই মিয়া ভাগেন এখান থেকে, নিজে মরবে আবার অন্যকেও মারবে’ গাজর মুন্সী ধরাস করে উঠে চলে যায় অন্য এক বারান্দায় সুখ টান আর সুখ টান বুদ্ধি আসে মাথায় দু’নম্বরী, দোকানে দোকানে যায় আর খরচ নিয়ে বলে, পাঁচশো টাকার ভাঙতি নাই, ভাঙতি করে দেই এই বলে বলে ব্যাগ ভর্তি করে খরচ নেয়, আর সেই দোকানের ত্রি-সীমানায় যায় না আলুর দোকানে যায়, আলু নিয়ে দোকানদার টাকা চায় গাজর মুন্সীর ঐ কৌশল আলুর দোকান ব্যাবসা ভালো খুচরা না থাকে? বরে, দ্যান খুচরা দেই মুন্সী ভাবে, সর্বনাশ, এবার বিপদ কৌশল খাটায়, থাকেন নোটখানা একটু ছেড়া আছে তো খুচরা করে আনি এই বলে একটু আড়াল হয়ে ড্র হয়ে যাওয়া দশটাকার লটারী তিনখানা নোট এনে দেয় আলুর দোকানদার ঝটপট নিয়ে রেখে দেয়, গাজর মুন্সী বলে, দুই টাকা ফেরত দেওয়া যায় না? না-না দেওয়া যাবে না মুন্সী চলে যায়

রাত্রের খাওয়া খেয়ে মুন্সী ঘুমায় গভীর ঘুম, আর স্বপ্ন দ্রাকে সে মারা যাওয়ার পর তার সুন্দরী স্ত্রী সুফিয়া অন্যের হাত ধরে চরে যাচ্ছে কোন এক অজানা জায়গায় আর গাজরকে মুরগী-ছাগ্রলর গোস্তের মতোরড চালিয়ে কাবাব বানিয়ে লবন-কাঁচা মরিচ দিয়ে খাচ্ছে পাওনাদার দোকানদাররা গাজর মুন্সী চমকে উঠে দেখে পাশে বউ নাই হাউমাউ করে কেঁদে ওঠে বউ এসে বলে, কি হল কাঁদো কেনো তুমি? মুন্সী বলে, তুমি কোথায় গেছো বউ? ‘কেন, বাইরে’! এক কাজ করো, আমি খুব খারাপ স্বপ্ন দেখছি, তুমি আমার ঐ জমা টাকার থেকে পাঁচশো টাকা দাও আর সকালে তাড়াতাড়ি ডেকে দিও বাজার যাইতে হবে’ ‘কেন, বাজার কেন আবার?’ ‘জান না বউ, যে খাবার খাইছি, তা সব হারাম খাবার’ ‘ধুর, খাবার আবার হারাম হয় নাকি?’ ‘হয় বউ হয়, কালকে কাউকেই খরচের টাকা দেই নাই’ ‘হায় হায়, কয় কি মুন্সী? ইজ্জত কাবা’ ‘না-না বউ, তোমার না, আমি কাবাব হইছি
গাজর মুন্সী গান ধরে-
কাঁচা বাজার আর চাউলের দাম
গা ঝড়িয়া বেড়াইল ঘাম
খালি হাতে খালি পাতে
ভাত খামো বাও সুধা ভাতে

উদ্ভট / আলমগীর কবীর বাবলু

সকালে হাঁটা সাস্থের জন্য উত্তম, উৎকৃষ্ট -কথাটা মকবুল মৃধা মনে-প্রাণে মানে এবং বিশ্বাসও করে। আর বিশ্বাস করে বলেই সে রোজ এই শরীরবিদ্যার কম্মটি নিয়মমত পালন করে। আজও ভোরে সে হাঁটার শ্রমসাধন কম্মটি সারছিল। কিন্তু শহীদ মিনারের কাছে এসেই মকবুল থমকে দাঁড়াল বা দাঁড়াতে বাধ্য হল। কেননা শহীদ মিনার চত্বর তখন লোকে লোকারণ্য। কুড়িগ্রামের সকল ‘সেলিব্রেটি’-ই সেখানে সমাগত। তারা সফেদ পাজামা-পাঞ্জাবি কিংবা বাঙালিয়ানা পোশাক পরে, মাটির সানকিতে করে সরষে-ইলিশ দিয়ে পান্তা খাওয়ার মোচ্ছবে মেতেছে। প্রথমে ব্যাপারটা ঠিকমত ঠাওর করতে না পারলেও শহীদ মিনারের চূড়ায় উড্ডীন বিশাল ব্যানারে ‘বাঙলা বর্ষবরণ উৎসব-১৪১৮’ লেখাটি দেখে সে ঠিকই বিষয়ের মর্মার্থ উদ্ধার করতে পারল। কিন্তু এভাবে বাঙলা বর্ষ উৎযাপনের ঘটনাকে সে কিছুতেই মেনে নিতে পারল না। বরং এটা এক ধরনের স্থুল পরিহাস বলেই তার চোখে চিত্রিত হল। বোধকরি এ পরিহাস দৈনন্দিন পান্তা খাওয়া কৃষক, শ্রমিক, মুটে-মজুরসহ দেশের আপামর হতদরিদ্র লোকদের সঙ্গে, কিংবা এ নিষ্ঠুর পরিহাস সারাবছর হিমাগারে তুলে রাখা বাঙলা সন-তারিখের সঙ্গে! কেননা, আজ যারা বর্ষবরণের নামে লোকদেখানো পান্তা খাচ্ছে, কিংবা ঘটা করে বাঙলা নববর্ষ পালন করছে, তারা কি নিয়মিত পান্তা খায় বা খাবে? পয়লা বৈশাখের পর তারা কি আদতে বাঙলা সন-তারিখের হিসাব রাখে বা রাখবে? তবে কেন এই লোকদেখানো উদ্ভট আয়োজন! উদ্ভট মঞ্চাভিনয়!

স্বল্পশিক্ষিত মকবুল মৃধা বাঙলা সন-তারিখ সম্পর্কে নিরীক্ষা করে দেখেছে, এদেশের তথাকথিত শিক্ষিত শ্রেণি নয়, বরং ঘোর গ্রামের অশিতি দরিদ্র লোকেরাই বাঙলা সন-তারিখের সঠিক ও বিশদ হিসাব রাখে এবং যথাযথ পালন করে। বরই আফসোস, মাতৃভাষা বাঙলা আন্তর্জাতিক ভাষা হিসেবে সারা বিশ্বে স্বীকৃত হলেও এদেশের সকল ক্ষেত্রে সকল দিবস, যেমন, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, শহীদ দিবস, স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস প্রভৃতি বাঙলায় নয় আজও ইংরেজি তারিখেই পালিত হচ্ছে! তাহলে সর্বস্তরে বাঙলা ভাষার প্রয়োগ, প্রসার, প্রচলন ও ব্যবহার কিভাবে ঘটানো সম্ভব?

মকবুল মৃধা আর ভাবতে পরে না। তার মাথাটা ভীষণ গুলিয়ে যায়।

বুধবার, ২৪ আগস্ট, ২০১১

লেখা পাঠান

সৃজন বের হচ্ছে।
লেখা পাঠান।
আগামী ১০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে....
লেখা পাঠান বিজয় সুতন্বী ফন্টে
tarunlekhokforum@gmail.com
-সম্পাদক

শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০০৯

সাহিত্য পত্রিকা `সৃজন' বেরিয়েছে

গল্প
আবদুল খালেক ফারুক
একাব্বর আলীর পদ্মপুরান
পদ্মা দিয়াছে আমায় মরণও ফাঁসি/ ঢেউ দিয়োনা কালা প্রাণ শশী/ কি করিবে দেবের পদ্মা/
কোনবা কাজও করে/ গাটা জলে নামিয়া পদ্মা গাটা মাঞ্জন করে/ কালা মায়সেন দিয়াছে আমায় মরণও ফাঁসি...।
একাব্বর আলী ওরফে কারেন্ট কবিরাজ নৃত্য-গীতের দলটির পুরোভাগে। তার পেছনে কয়েকজন সাগরেদ। তাদের সাথে রয়েছে গ্রামের কয়েকজন কিশোরী। একাব্বর আলীর নেতৃত্বে চলছে এক আজব কিসিমের চিকিৎসা পদ্ধতি। চৌকির উপর বসে আছেন রোগী মোহাম্মদ আবদুল করিম। চোখ, মুখ আর গায়ের চামড়া ক্ষানিকটা ঝুলানো।। দেখেই বোঝা যায় বয়স ৭০ পেরিয়ে গেছে। চিকিৎসার অংশ হিসেবে এখন তার হাতে পায়ে চলছে তেল মালিশ। একজন গামছা দিয়ে তার মাথা থেকে পা পর্যন্ত ঝাড়া দিচ্ছেন। রোগীকে ঘিরে বৃত্তাকারে ঘুরছে নৃত্য-গীতের দলটি। গানে সঙ্গত করার জন্য একজন ব্যানা বাজাচ্ছেন। তারা গাইছেন মনসার জারী। কিংবা বিষহরা গান। রোগীর হাত পা অবস। কোন শক্তি নেই। কবিরাজ বলেন বাসলি হয়েছে মনসার অভিশাপে। সাপের নি:স্বাশ থেকে এই অসুখ। তাই মনসার জারী দিয়েই ফাঁড়া কাটতে হবে। একাব্বর কবিরাজ চ্যালেঞ্জ দিয়ে চিকিৎসা করেন। বলেন, যেখানে ডাক্তারের শেষ, সেখানেই আমার শুরু। অর্থাৎ ডাক্তার ফেল মারলে ডাক পড়ে কারেন্ট কবিরাজের। তারপর মনসার নামে সাত দিন সাত রাত্রি গীত গেয়ে নামাতে হয় বিষ। কারেন্ট কবিরাজ আওয়াজ দেন, শরীরে ঢুকেছে মনসার বিষ। তাই মনসার কৃপা বিনে এই রোগের চিকিৎসা নেই। অবশ্য তিনি সমঝদার। তাই বোঝেন, শুধু নৃত্য গীতের উপর ভরসা করলে চলে না ; এর সাথে সাপের তেলসহ ৩০ পদের দ্রব্য মিশিয়ে তৈরী হয় মালিশের তেল। দুইয়ে মিলে রোগী ফিট। কারেন্ট কবিরাজ হিট। কবিরাজ চ্যালেঞ্জ নিয়ে চিকিৎসা করেন। পার্টির ভাও বুঝে পারিশ্রমিক নেন। দেড় হাজার থেকে ১৫ হাজার পর্যন্ত পুরো প্যাকেজ। সাগরেদদের পারিশ্রমিক আর কিশোরীদের উপহার বাদে বাকীটা তার। মাসে দুই তিনটি খ্যাপ অনায়াসে মেলে। রোগী অল্প বয়সী হলে সুস্থ হবার ১০০ ভাগ নিশ্চয়তা। আর বৃদ্ধ হলে নিদেন পে হাটা চলার আশ্বাস দেন। ঝাড়া দিয়েই রোগী একবারে খাঁড়া। কারেন্ট কবিরাজ গেয়ে ওঠেন- মস্তকেতে ছিল বিষ মোর/মঞ্চবে নামিল/ দোহাই ও মা পদ্মার হুংকারে/ বিষ পানি হইয়া গেল।
নৃত্য গীত ক্ষানিক বন্ধ রেখে এক গল্প বলেন সমবেত দর্শক শ্রেতাদের উদ্দেশ্যে। শ্রোতাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী । তাতে আরো বেশী জোস অনুভব করেন কারেন্ট কবিরাজ। কারণ এই মনসার গান গাইতে গিয়েই তার সাথে ভাব ভালবাসা হয়েছে দুই রমণীর। ঘটনাচক্রে তারা এখন তার ঘরণী। কবিরাজের বাবরী চুল, আর টানা চোখ এই রমণীদের চিত্ত হরণের জন্য যথেষ্ট। তিনিও রমণীকুলের দিলে চোট দিতে একেবারে রাজী নন। তাই কাজী ডাকতে তার বিলম্ব হয় না।
কবিরাজ বয়ান করেন-একবার হয়েছে কি তখন জৈষ্ঠ্য মাস। এক রোগীর বাসলি ঝাড়া চলছে। পদ্মপুরান গানের সুর, তাল , লয় তখন তুঙ্গে। রোগীরও অবস্থা উন্নতির দিকে। হঠাৎ ফোঁস করে ফণা তুলে সেখানে হাজির হয় এক কেউটে। লম্বা ফণা তুলে দাঁড়ায় রোগীর সামনে। তন্ত্র-মন্ত্র দিয়ে যখন দিব্যি দিলাম মহারাজ তখন ফণা নামিয়ে ধীরে ধীরে চলে গেল বাড়ির পাশের জঙ্গলে। নিজের জারি জুরি জানান দিতে গলদঘর্ম একাব্বর। এক ধরণের রহস্য সৃষ্টির বাহানা আর কি!কবিরাজ আবার গেয়ে ওঠেন-
ও বিষ নামিলরে/ কালিয়া গঙ্গা হারের বিষ মোর নামিলরে/
বিষ ছিল মোর মস্তখানে/ নামল বিষ মোর জবান খানে।
এই জীবনে তিনি কোন কেসে ফেল মারেন নাই। বিষহরা গেয়েই তিনি কাত করেছেন যাবতীয় দুষ্টদের। একথা বলে এক ধরণের বুজুর্কি দেখাতে চান তিনি। হঠাৎ আরো জোসে গেয়ে ওঠেন-
শিব নিল ঢাল তরোয়াল/ চন্ডি নিল ঝাঁটা/
মায়েদের কাইয়া পথ দেখাইয়া/ কালি দেখায় ঘাটা/
চারিপাশে চারি গোমজি মধ্যে খাস গড়ি/ বৌমা জ্বলিয়া ওঠে বল আল্লা নবী।
সমবেত নারীকুলে তখন তন্ময়তা ভর করেছে। কেউ কেউ শাড়ির আঁচলে মুখ লুকিয়ে হাসছেন। একাব্বর আলীও তখন তন্ত্র-মন্ত্র বলে যাচ্ছেন অনর্গল। এসময় ঘটে বিপত্তি। এই সাইকেল আরোহী কিশোর এসেছে নাগেশ্বরীর পোড়াডাঙ্গা গ্রাম থেকে। ছেলেটি কবিরাজের প্রতিবেশী। সে নিয়ে এসেছে এক ভয়ঙ্কর দু:সংবাদ। যার সংপ্তি শিরোনাম হতে পারে‘ সাপের কামড়ে কবিরাজ পুত্রের মৃত্যু’।

আলমগীর কবির বাবলু
সহি রাজাকারনামা
যখন অন্ধকার রাতের নীরব আকাশের বুকচিরে কতগুলো বাদুর পতপত করে উড়ছিল তখন পাঁচ গেরিলাযোদ্ধা সফল অপারেশন শেষে ডেরায় ফেরার চিন্তায় অস্থির, উদ্বিগ্ন, উৎকণ্ঠিত। কিন্তু নিশুতি রাতের নিকষ আঁধারে তারা কিছুতেই পথের হদিশ পাচ্ছিল না। এদিকে খিদেয় পেট চোঁ চোঁ করছে। কান্তিতে বুজে আসছে চোখ। তবু কাছে-দূরে কোনো লোকালয়ের দেখা মিলছিল না। এই ঘোর দুর্যোগে গেরিলাদল কেবল ধানি জমির সরু আলপথ ধরে রাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে বেদিশার মতো হাঁটছে তো হাঁটছেই। ঠিক সেসময় পাশের তে থেকে এক যুবক উঠেই ভোঁ-দৌড় দিল। চকিতে গেরিলাদল রাইফেল হাতে সতর্ক-পজিশন নিল। সেকশন কমান্ডার আয়নাল মোলা গর্জে উঠল, `হল্ট।' বোধকরি রাইফেল তাক করার শব্দে ত্রস্ত যুবক তৎণাৎ হাত ওপরে তুলে ফ্রিজ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। গেরিলাদল চারদিক থেকে যুবককে ঘিরে ফেলল এবং তার আগপাশতলা খুব ভাল করে নিরীণ করে মোলা জিজ্ঞেস করল, `অ্যাই, কে তুই? এখানে কী করছিলি?'
-আমি করিম। স্কুল শিক্ষক। এখানে পায়খানা করছিলাম। যুবক ভয়ার্তস্বরে জবাব দেয়।
-বাড়িতে ল্যাট্রিন নেই?
-আছে। কিন্তু আজ আত্মীয়ের বাড়িতে এতটাই গুরুপাক খেয়েছিলাম যে, পেটটা ভীষণ মোচড়া-মুচড়ি শুরু করে দিয়েছিল। তাই বাড়ি ফেরার আগে বাধ্য হয়ে ক্ষেতেই প্রাকৃতিক কার্য সারছিলাম।
করিমের বোকা-বোকা উত্তর।
-তা আমাদের দেখে দৌড়াচ্ছিলি ক্যান?
-ভয়ে।
-কীসের ভয়?
-রাইফেলের।
- তুই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে না বিপক্ষে? অকস্মাৎ প্রসঙ্গ পাল্টায় মোলা।
-আমি কোনো পক্ষে নই, আমি বেঁচে থাকার পক্ষে।
-তার মানে তুই সুবিধাবাদীদের পক্ষে। তোর মতো কাওয়ার্ডের বেঁচে থাকাটাই বৃথা, গ্লনিকর। তুই ওপারে যাওয়ার জন্য তৈরি হ। লা-ইলাহা পড়।মোলা মুহূর্তে যুবকের মাথায় রাইফেল ঠেকায়, তাক করে। মৃত্যুভয়ে করিম দরদর করে কাঁপতে থাকে। আর জোরে জোরে `লা-ইলাহা ইল্লা আন্তা...'পড়তে থাকে। কী মনে হতে আয়নাল মোলা তাক করা রাইফেলটা নামিয়ে নেয়। চোখে কৌতূহল নিয়ে করিমের দিকে তাকিয়ে বলে, আমাদের সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধে যেতে পারবি?
-পারব। অবশ্যই পারব।
-যা, এই শর্তে তোকে মাফ করে দিলাম।
করিমের ধড়ে যেন প্রাণ ফিরে আসে। নতুন এক পরমায়ু পেয়ে সে অনেকণ ধরে শ্বাস নেয়। মোলা ফের জিজ্ঞেস করে, এখান থেকে তোর বাড়ি কতদূর?
এই মাইলখানেক।
-আশপাশে কোনো মিলিটারি-ক্যাম্প আছে?
-না, নেই। -
মুক্তিক্যাম্প?
-তিন-চার মাইল দূরে একটা আছে।
-আমাদেরকে সেখানে নিয়ে যেতে পারবি?
-অবশ্যই পারব।
-তাহলে চল, এবার তোর বাড়ি যাই। একটু খাওয়া-দাওয়া করি, বিশ্রাম নিই। খিদেয়-কান্তিতে চোখ-পেট জ্বলছে; প্রাণবায়ু নিভে আসছে।

খ.
গেরিলাদল করিমের বাড়ি গিয়ে পেটপুরে মুড়ি খেয়ে টুয়েন্টি নাইন খেলায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। অন্দরে রান্নার মৃদু টুংটাং শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। এদিকটা বেশ ফাঁকা, নির্জন। বাসা-বাড়ি নেই বললেই চলে। কতণ জানা নেই, গেরিলাদের পেটে তখন খিদেটা চাগিয়ে উঠেছে। মোচড় দিচ্ছে। তারা তৎক্ষণাৎ করিমকে ডাক দেয়। কিন্তু নেই! কোনো সাড়া-শব্দ নেই! সমস্ত বাড়ি যেন ধু ধু প্রান্তর, বিরানভূমি! লোকজন কোন ফাঁকে চম্পট! অজানা শংকায় পেয়ে বসে মোলাকে। কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। বেড়ার ফাঁক গলে সে দেখে, শত্রু পক্ষ তাদেরকে চারদিক থেকে অবরুদ্ধ করে ফেলেছে। আর সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছে তাদের আশ্রয়দাতা-অন্যদাতা করিম। এই নিরাময়হীন নিষ্ঠুর সত্য অবলোকন করে রাগে-দুঃখে-ক্ষোভে-আক্ষেপে মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করে মোলার। কিন্তু করার কিছুই নেই। খানিক বাদে করিমের মুখ থেকে হ্যান্ডমাইকে আত্মসমর্পণের আদেশ ভেসে আসে। অনবরত। খাদের কিনারে দাঁড়িয়ে, চোয়াল শক্ত করে তৎক্ষণাৎ করণীয় ঠিক করে ফেলে মোলা। সহযোদ্ধাদের শেষবারের মতো নির্দেশ দেয়, ঘরের বেড়া ফেলে দেয়ামাত্রই গুলির তুবড়ি ছোটাবে। যদি মরতেই হয়, তবে একের বদলে দুজন করে মেরে তবেই মরব; তবুও হানাদারদের কাছে আত্মসমর্পণ নয় কিছুতেই। আর ঐ নরপিশাচ রাজাকারের বাচ্চাটা যেন বাঁচতে না পারে সেদিকে খেয়াল রাখবে।বলেই আলগোছে ঘরের বেড়ার বাঁধন খুলে ফেলে মোলা এবং সজোরে লাথি মেরে ওটাকে ফেলে দেয়। প্রায় সাথে সাথেই আকাশ-বাতাস প্রকম্পিত করে অসংখ্য রাইফেল একযোগে গর্জে ওঠে। যদিও তখনো অন্ধকার কাটেনি, ভোর ফোটেনি।

কবিতা
মিজান খন্দকার
ভ্রমণ
আমিষের জটিল প্রসঙ্গে জড়কুলে লোহাও হারায় তার ধর্ম
জাত-কর্ম। এরূপ স্খলনকালে একই প্রকারে আবার
ছড়িয়ে পড়তেও পারে কোনও বিস্মৃতি? সেই ভয়ে
আত্মপরিচয় বর্ণিত লিপিখানি উত্তরের পান্থনিবাসে
পাঠিয়ে দিয়েও আজ সংশয়ে দোলে কতো মন!
ফলে আজ ছড়ানো-ছিটানো বিগত দিনের সব লৌহভাবাপন্ন প্রাণ
পুনশ্চ সংগ্রহ করি , নিঃসংশয়ে খুলে বলি তাদেরও যতো ভ্রমণ-বৃত্তান্ত।
আদ্যোপান্ত দণি-প্রবণ আরও কতো না দেহ খুলে হৃদচিত্রে
আদ্যবিন্দু খুঁজি আর ধুলোয় সন্ধান করি অবিকল সাঁই।
অথচ ধুলোয় পুষ্প-গড়ন কতো দেহ খুলে কতো সারমর্ম নিয়েছো কেড়ে
বলো তো গোসাঁই? বলো, ধুলোর ধর্ম ভুলেও
কী প্রকার শাস্ত্রমতে আবার গংগাজলেও থাকো ভেসে?
যারা ছিলো ডালে, রৌদ্রগন্ধে ভরা সেই ডানারাও জানে,
এতোটা বয়স হলো তবু বনবাসী এক মেয়ে
একজনও পুরুষ দেখেনি এখনো! আমি তো পথিকমাত্র;
অথচ ঋত্বিকপুত্র ভেবে তপোবনে ডেকে নিয়ে
আমাকেই দেখালো সে পথ। দেখি, সেই পথে
বহুদূরে সূচকরেখার প্রান্তবিন্দুতে জ্বলছে আনন্দঘন সবুজ প্রাণ।
জেনে গেলাম যে, যেতে যেতে অবশেষে ওই পথেই একদিন ভ্রমণও ফুরোবে।

মাইকেল রবিন সরকার
পাশের ফ্ল্যাটে সারারাত একটা ইঁদুর শুয়ে ঘ্যানঘ্যান করে

গায়ের গন্ধ ধুতে রাতের বাসি কাপড়ে
মেয়েটা সরে আসেওদিকে পাপীমন ভাবে অন্য কিছু
অন্য কোনো ঘটনা।

এই ফ্ল্যাটকে আমি আমার
বাড়ি ভাবতে পারি না
কিংবা একটু আগের
স্কুলবালিকাকে প্রেম।

আমার বান্ধবী, কালো-মুখরা মেয়ে
ল্যাম্পপোস্টের ঝিম ধরা আলোয়
সাদা সাদা বাচ্চা খুঁজত।

ওর এই চাওয়ায় আমি
কোনো ভুল দেখি না
মানে দেখতাম না, মানে
আমিও ছিলাম।

এই বৃষ্টিদিনে
আমি আমার প্রথম প্রেমিকাকে হারাই।
অথচ এই ঝড়জলের রাতেও
কোথাও বিয়ে হচ্ছে, কোথাও...

রবীন্দ্রবালিকা
খুব কি মিস কর
আমার সঙ্গ?
চেয়ে দেখ
আমার মুঠোবন্দি হাত
এখনও প্রার্থনারত।

আবু সাঈদ
তোমার জন্য

কখনও কবিতা লিখিনি
তবুও বাসনা তোমার জন্য
কখনও কারও চোখে হারাইনি
এখন চোখে চোখ রাখি
তোমার জন্য
কখনও চোখের কোণে
সৃষ্ট হয়নি-এমন
ঝড় আসে তোমার জন্য
কখনও স্বপ্ন্ও দেখিনি এভাবে
এখন দুচোখ ভরে স্বপ্ন আঁকি
তোমার জন্য
হৃদপিণ্ডের প্রতিটি স্পন্দন
শুধু তোমার জন্য...

আব্রাহাম লিংকন
লজ্জা
সমগ্র আফগানের মৃত্তিকা
এখন মলিন, তামাটে।
তোমার হাজার-কোটি ডলারের
চৌকস গোয়েন্দারা
খুঁজে পায়নি লাপাত্তা লাদেনকে!

আলেন্দে থেকে বঙ্গবন্ধু
কখন মৃত্যুবরণ করবে
তুমি তার লগ্ন ঠিকই নির্ধারণ করেছিলে।
কিন্তু পারনি টু-ইন-টাওয়ার
রক্ষা করতে।
তোমার ব্যর্থতার ক্ষোভে
তামা হয়ে গেল কান্দাহার-কাবুল।
তোমার ঔরসজাত তালেবান
তোমাকেই ঘৃণা করে।
তোমার কি লজ্জা হয় না
সাম্রাজ্যবাদ?

জামাল অন্তর
দুরবীন দূরত্বের পাখি
তোমার একগুচ্ছ চুল আর
একুশটি লাল-নীল টিপ
এখনো একটি সময়ের পতাকা ওড়ায়।
ছোট্ট সুন্দর ছায়াদেশ
নিষিদ্ধ নগরী
সাঁকো পেরিয়ে সরু সিঁথির মতো পথ
শহরান্তের ছোট নদী
হাঁটুজল ভেঙে ভেঙে দেখি
তারার রোদ্দুরে পুড়ে গেছে
মৌমাছি দিন; আর
দুর্বৃত্ত রাত্রির অন্ধকার
চেটেপুটে খেয়ে বসে আছে সব
নত্রের শিশির।
তোমার প্রতীতি প্রতিটি চিঠি
এখনো আমার কবিতার চর্যাপদ
মদনমোহনকে
অস্বীকার করে নয়
সত্য-সুন্দর আর জগৎকে চিনেছি আমি
তোমার বিশুদ্ধ ধারাপাতে।
ইচ্ছে ছিল বেগুনের গাছে
ছোট্ট একটা টুনটুনি জীবন,
কর্ণফুলির স্নিগ্ধ জলে স্নান করবে তুমি
টাটিতে শুকোতে দেবে শাড়ি
তোমার একরত্তি মেয়ে
পাঠশালা জীবন তার
আর, তুমি বসে যপ্রহর গুনছ
অথচ আজ কতদিন জানালায় ভয়ঙ্কর রাত
একরাশ লুঠেরা বাতাস
আমাকে ওড়াতে চায়
কল্পনা চাওলার আকাশে
অতঃপর
কী ভেবে উড়িয়ে দিই তোমার
কফি-রঙ ওড়নাটা।

যেখানেই থেক আজ প্রশ্ন করো না
ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাক ওটা
তারায় তারায় ছায়াপথে ছায়াপথে
যেখানে সময় তোমাকে আমাকে কখনও বিচ্ছিন্ন করে না।
কিংবা গ্যালিলিওর দুরবীনে ধরা পড়–ক
ঐ অনিকেত ওড়নাটা
বিখ্যাত মিডিয়াগুলো আজ
ফলাও করে ঘোষণা দিক
অচেনা ছায়াপথে এক কিশোরীর
অস্তিত্বের সন্ধান।

তারিফ উল হক
সকালের কবিতা
দোয়েলের ডানায় উড়ে গ্যাছে অন্ধকার
রজনীগন্ধা আকাশ ছেঁয়ে ফেলেছে পৃথিবী
বন্ধ দরোজাগুলো খুলে যাচ্ছে ধীরে ধীরে

পেয়ালার মত এক সকাল মানুষের জনপদে
পুনর্জন্মে অথবা আবারও মিথ্যা সুন্দরের পিছু
দিগি¦দিক ধাওয়ায় পিচঢালা রাস্তারা
ধীরে ধীরে একাকার।
এ সকালে কোনো দীর্ঘশ্বাস নেই,
কোনো দুঃস্বপ্নও।

বাদল সাহা শোভন
বৃষ্টি এসেছে মনে
গতকাল রাতে
প্রচণ্ড বৃষ্টি হয়েছিল।
প্রথমে মেঘ তারপর বজ্র
অতঃপর বর্ষণ।

প্রবল বর্ষণে
ভিজে গিয়েছিল
বকুল গাছটা
ঘরের চাল
ডায়ানথাস ফুলগুলো
মসৃণ উঠোন...
তারপর বৃষ্টি থেমে গেল,
সবকিছু নিশ্চুপ।
মধ্যরাতে আবারও
মেঘ, মনের উঠোনে
তারপর বজ্র
সবশেষে বৃষ্টি।
ভিজে গেল তোষক, বালিশ
ভিজল লেপ-কাঁথা
আর নেত্রযুগল নোনা পানিতে।

সুর্যের প্রখর রশ্মিতে সবকিছুই
শুষ্ক হয়ে উঠল
শুধুমাত্র চোখের গহ্বর থেকে
সৃষ্ট হলো নায়াগ্রা।

অনন্যা গোস্বামী
আয়নায় দেখি তাকিয়ে
সে বড় ক্লান্ত থাকে আজকাল।
খুব নিস্পৃহ, অবসন্ন!চোখদুটো তার ভীষণ খোলা।
বুজে আসে অজান্তেই-আনমনে!
সে বড় একলা থাকে আজকাল।
সহায়, নিঃস্ব যেন!
নিতান্ত অবুঝের মতো দৃষ্টি তার।
হারিয়ে যায় দূরে কোথাও-ইচ্ছাকৃত।
সে বড় অস্থির থাকে আজকাল।
অশান্ত; কিছুটা উচ্ছৃঙ্খল!
চুলগুলো তার উশকো-খুশকো।
কপালের ওপর এলিয়ে পড়ে আলতোভাবে!
সে বড় অসুস্থ থাকে আজকাল।
অসাড়, দুর্বল, অত্যন্ত ঠুনকো!
দেহখানা তার প্রচণ্ড নড়বড়ে।
ভেঙে পড়ে যায়-ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন!
সে বড় লুকিয়ে থাকে আজকাল।
অদৃশ্য, অস্পষ্ট, আবছা!
উপস্থিতি তার কেমন যেন
বোধহয় মুছে যাচ্ছেস্বতঃস্ফূর্তভাবে!
সে বড় শূন্য থাকে আজকাল।
ঝাপসা; কতকটা অনিশ্চিত!
অস্তিত্ব তার ধীরে ধীরে প্রবেশ করছে
সত্তাহীনতার কাল গহ্বরে।
নিরুপায় হয়ে!

জাকিউল ইসলাম ফারুকী
স্বপ্নের মতো
স্বপ্নের মতো প্রিয় নারী চাই
পাইনি।
কখনো সহসা অধীর হয়েছি
প্রেমের ফসলে চপল থেকেছি
চোখের তৃষাতে ব্যাকুল নয়নে
তোমাকে দেখতে চাইনি
স্বপ্নের মতো প্রিয় নারী চাই
পাইনি।
তুমি চলে গেলেমনে হতো সব মিথ্যে
তুমি ফিরে এলে
গল্পের ছায়া ভরে যেত নানা তথ্যে
কাহিনী কখনো সত্যের মতো হয়নি
স্বপ্নের মতো প্রিয় নারী চাই
পাইনি।
ভোলাতে চেয়েছ
অশ্রুর বাণী দিয়ে
আমি তো তোমার শত জনমের
প্রেমের সত্য নিয়ে
চিনেছি আকাশের ধ্রুবতারাসম জ্যোতিতোমাকে
জেনেছি আমারই সম্মতি
তবুও কখনো অস্থির হয়ে
তোমারই পিছু ধাইনি,
স্বপ্নের মতো প্রিয় নারী চাই
পাইনি।

ফেরদৌসী রহমান বিউটি
খুঁজে ফিরি
(রবীন্দ্রনাথকে)

বাংলার ভাগ্যাকাশে তুমি জন্ম নেবে বলে হয়তো
বাংলার আকাশ এত সুনীল
প্রকৃতি এত শ্যামল।
তোমার লেখনির মহিরুহ শক্তি
বাঙালির চেতনায় অঙ্কুরিত হয়েছিল,
স্বাধীনতার বীজ।
লব্ধ করেছি মোরা
ভাব, ভাষা ও মাকে

তোমার হৈমন্তীরা আজও নিপীড়িত
যৌতুকের দায়ে হচ্ছে বলিদান
নাড়া দেয় সুপ্ত অবচেতন মনকে
তোমাকে খুঁজে ফিরি মোদের সত্তায়।

ইউসুফ আলমগীর
ভূমিপুত্র
কি কথা কও ভূমিপুত্র ভাওয়াইয়ার সুরে
সুর আর স্বরে এতো ভাব-ভাবনা
ভবের আবেশে আজ শুধু কামণা
কামুক সিক্ততায় আটকাও জীবনের চরে
জেগে ওঠা চরে
লাগে বসতের ঢেউ
ঢেউয়ে ঢেউয়ে ভাসে
স্বপ্নের শুভ্রতা...

সোলায়মান বাবুল
বসতি
বারান্দাটা;
খোলা আকাশে প্রান্তহীন গাঢ় নীলে
মুক্ত হেঁটে বেড়াচ্ছি।
শ্বাস-প্রশ্বাসগুলো খেলতে থাকে;
কোত্থেকে কতগুলো হলুদ, কতগুলো বেগুনি, কতগুলো কমলা রঙের
ছেঁড়া মেঘ নিয়ে আসে! নিয়ে আসে অজস্র তারকারাজি
নিয়ে আসে ভাসমান শিলাখণ্ড কিছু!
প্রতিটি শিলাখণ্ডে অঙ্কিত আমারই পদচ্ছাপ,
প্রতিটি তারকা পুঞ্জে আমাতেই জ্যোৎস্না
আর ছেঁড়া সেসব মেঘের দোলাচল বেশ!

শোবার ঘরটা;
পঁচিশে মার্চ একাত্তরের রাত দশটায়
অজস্র ঝাঁঝালো মর্টার, মেশিনগান যখন
ঘুমন্ত রাত্রির বুক ভেদ করে আমাদের শয়ান খুঁজে বেড়ায়;
মাতৃরূপ স্নেহ-বাৎসল্য কী অপার মহিমায় বুকে আগলে রাখে
বলে, বৎস শান্ত হও।
এঘর ওঘর সেঘর;ছ'টি প্রাণ হাত ধরাধরি করে
এক প্রাণের একটি ছায়া রচনা করে
সে ছায়া একহারা গড়নের পিতৃরূপ একটি আশ্রয় গড়ে তোলে
পিতা তার প্রসারিত দু'বাহুতে আমাদের ঘুম-জাগরণ
আর বয়সের দুর্বহ ভার বয়ে বেড়ান অবলীলায়।
আর ছোট ছোট গল্প শোনান রাজকুমার রাজকন্যার!

ডেভেলপার;
স্মৃতিচিহ্নগুলো যেখানে মূল্যহীন
যেখানে মুদ্রাযন্ত্রের দীাগ্রহণ মুখ্যতর
জীবন দ্রুত যন্ত্রমান হবার প্রতিযোগিতা
কী ছিল কোথায়? কী দরকার সে জ্ঞানে?
এমত প্রশ্নবাক্যে হৈ হৈ রৈ রৈ
আর হাতুড়ি, শাবল ধুমাধুম
হা, বসতি আমার!

নাসির যোয়াদ
ঝাউদিঘি
জীবনের মূলরেখায় যেতে চেয়ে
অবশেষে জানলাম
চেষ্টা শব্দটার সৃষ্টি ব্যর্থতায়।
জীবনের বেশিটা সময় কেন হতাশায়?
জানলাম,
তুমি মূলরেখার দুঃখ দিয়ে গঠিত।
নিরাকারের রূপ দেখার ইচ্ছে
আকার হওয়ায় কেন উধাও?
জানতে পারলাম, আকার দ্বারাই
নিরাকার গঠিত হয়।
দিনরাতের মুখাপেক্ষিতায়কোনটি মহান?
বোঝা গেল, আমি দাঁড়িয়ে আছি দিনে
কিন্তু এখনো রাত।
জীবনের অন্ত-আদি খুঁজি
দেখি, সব কালই বর্তমান
আমি নিস্তব্ধ

বই আলোচনা
মাহফুজুল ইসলাম শামীম
যুদ্ধার্থীগণ পুনশ্চতেও কাতরায়
প্রধানত কবি তিনি। কাব্যের গূঢ় রহস্য উদ্ঘাটন করতে করতে ছোটগল্পের ডিঙি নৌকোয় পা দিলেন মিজান খন্দকার (১৯৬০-)।আশা তাঁর-`পুনশ্চ যুদ্ধার্থী'গণ নামবে যুদ্ধে, স্বাধীনতার চেতনাকে বুকে নিয়ে গড়বে নতুন বাংলাদেশ। কিন্তু `দখল' থেকে মুক্তি না পেয়ে তারা কি `ডানা' মেলে ছুটেছে শূন্যতার পানে? গ্রন্থিত চারটি গল্পে এ সত্যই তো ধাবমান।
নদী, নারী কিংবা প্রযুক্তি দখলের বয়ান...সভ্যতার সাথে নদীর প্রবহমানতা সর্বজনস্বীকৃত। নদীর নিজস্ব অন্তর্ময় ভাষাকে বিদীর্ণ করেছে সভ্যতার অনিবার্য অনুষঙ্গ প্রযুক্তি। প্রাযুক্তিক উৎকর্ষ শুধু জলের চরিত্র নয়, জলজীবনকে দাঁড় করিয়েছে নানা প্রশ্নের মুখোমুখি। সুবোধ ঘোষের অযান্ত্রিক বিমল যন্ত্রের সাথে সখ্যতা গড়লেও মিজান খন্দকারের নুরুল যন্ত্রসখা হতে পারে নি। পারেনি বলেই বদরুদ্দিনের হাতে তাকে হতে হয়েছে নির্যাতিত, নিগৃহীত। কিন্তু প্রাযুক্তিক-পুঁজি জন্ম দিয়েছে যে ঘাটিয়ালের তারা কোনো সমাধানে পৌঁছাতে পারে নি। পরিবর্তনে সায় দিতে না পারায় অন্তর্দ্বন্দ্বে বিক্ষত নুরুলের চৈতন্যপ্রবাহে এক অনাম্নী নারীদেহের আগমন ঘটেছে সত্য, তবে খোতের সঙ্গে চাঁদের আলোয় বিক্ষোভমিশ্রিত মিলনই হয়েছে তার পরিণতি। সম্মত্তির ব্যক্তিগত মালিকানার উদ্ভবের সূত্র ধরেই পুরুষ নারীর ওপর সমাধিকার স্থাপনের চেষ্টা চালিয়েছে। নদী আর নারীর দ্বৈরথে বিভক্ত হয়েছে নুরুলের সামূহিক চেতনা। `দখল' গল্পের শুরুতেই তাই চেতন-অবচেতনের অবিরাম প্রবাহে বিনষ্ট হয়েছে নুরুলের ঐতিহ্যিক অভিজ্ঞান। গল্পকারও কোনো প্রতীকী পরিচর্যায় না গিয়ে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে বিবৃত করেছেন কার্যকারণ। কুড়িগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় ধরলা তীরের জীবনবাস্তবতার এ এক অনুপম আলেখ্য- `বউকে মনে পড়ে তখন, গ্রামে যখন তার বাড়িভিটা সব ছিলো, স্বচ্ছল সংসার ছিল, তখন খোতের শরীরও যৌবন-লাবণ্যে নদীর মতোই এমন ঝলমল করে জ্বলতো, ঝলসাতো। একটা দীর্ঘশ্বাস তার কলজেটাকে ধারালো ছুরির মতো ফালা ফালা করে কেটে কেরিয়ে আসে বুক থেকে।' [দখল]
কাক, পাখি আর স্বাধীনতার প্রতিবর্গীকরণ...`মানচিত্র মানে একটা দেশ, একটি পতাকা, কিছু মানুষ এবং স্বাধীনতা। আর স্বাধীনতা হলো বৃরে মতো, একটু একটু করে ফলবতী হয়ে ওঠে।'... না, আটত্রিশ বছরেও আমাদের শিশু স্বাধীনতা-চারাগাছটি বৃক্ষ হয়ে ওঠে নি, ফলবতী হওয়া তো সুদূরপরাহত আকঙ্ক্ষা। চার দশকের দৃশ্যমান বাস্তবতা এখন রূপ নিয়েছে ভয়ঙ্কর মূর্তিতে। রাষ্ট্রকাঠামোর এমন কোনো গলি নেই আজ যেখানে জন্ম নেয় নি পঁচা দুর্গন্ধময় ডাস্টবিন। সে ডাস্টবিনগুলোর নীরব দর্শক একটি বা একগুচ্ছ কাক। তিনটি পরিচ্ছদে ভাগ করে পঁয়ত্রিশটি বিচ্ছিন্ন দৃশ্যাবলীর এক কোলাজ ক্যানভাস তৈরি করেছেন মিজান খন্দকার তাঁর `পুনশ্চ যুদ্ধার্থীগণ' গল্পে। গল্পে বর্ণিত প্রতিটি দৃশ্যপটই সাদা চোখে দেখবার মতো কিন্তু অন্তর্কাঠামোর বাস্তবতা উপস্থাপিত হয় নি। কাকের চোখ দিয়ে দেখে তাতে জল জমে নি গল্পকারের। এ নির্বাক নির্মোহ বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি পাঠককে মুগ্ধ করে তবে আর্থকাঠামোর স্বরূপ বিশ্লেষণাত্মক দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োগ ঘটলে পাঠক নিজেই হয়ত হতো এক একজন যুদ্ধার্থী। কেননা, দর্শক-পক্ষীকুল তো `সম্ভ্রম-বিজরিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো পুনশ্চ উদ্ভব হওয়া যুদ্ধার্থীগণের দিকে'ই।
জীবন যাত্রার খণ্ডচিত্র...কোচটির নাম জীবন এক্সপ্রেস। কুড়িগ্রাম থেকে যাত্রা শুরু, গন্তব্য ঢাকা। ড্রাইভার কন্ডাক্টরসহ মানুষ ৩৮ জন। গল্পটির মোট চরিত্র ১৮। বাকি ২০ জনের নাম-পরিচয়-পেশা অনুল্লিখিত। কুড়িজন আরোহীর পঞ্চাশটি ভিন্ন ঘটনা প্রবাহ ও আলাপচারিতার গল্পিক ভাষ্য `একটি দূরপাল্লার কোচ ও গতির অভ্যন্তরে কিছু বহুভেদক প্রাণ'। গল্পকার গল্পটি সর্বজ্ঞ দৃষ্টিকোণ থেকে উপস্থাপন করেছেন। বয়ানের ভাষায় কাব্যময়তা স্পষ্ট। একদিকে গর্ভবতী নারীর বাচ্চা প্রসব জীবনের ইঙ্গিতবাহী আবার পরিণতিতে মৃত্যু যেমন গাল্পিক দ্বন্দ্ব (পড়হঃৎধংঃ) তৈরি করেছে তেমনি গল্পকারের ভাববাদী দর্শনেরও বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে। ইতিহাস-দর্শন-রাজনীতি-জীবন-প্রজন্ম দ্বন্দ্ব-মফিজ চেতনার দ্বিমুখী ব্যাখ্যায়ন-পেশাভাবনা-অর্থনীতি-সমাজচেতনা-ফ্যাশনাবেশ-জৈবিক প্রবৃত্তির সামষ্টিক দর্পণ হয়ে আছে গল্পটি। পেশার সঙ্গে ভাষার বহুমুখীনতা গল্পটির প্রাণ। নিরীক্ষাপ্রবণ গল্পের প্রথাগত পরিসমাপ্তি গল্পটির শিল্পসৌন্দর্য্য ক্ষুন্ন করলেও সর্বজ্ঞ লেখকের ঘটনা পরিবীক্ষণের স্থান ও কাল পাঠককে প্রশ্নের মুখোমুখি ঠেলে দিয়েছে।
সাবিত্রী আর জোবেদার আর্তচিৎকার...বীভৎস সমাজের পাশবিক হিংস্রতার হাত থেকে রক্ষা পায় নি তাঁরা। `ওমার নাম আল্দা, ধর্ম আলদা, কিন্তুক ওমরা জাতে এক। ওমরা রাখাল হয়া সাবিত্রীকে পোড়ায় মারে, সোবহান হয়া জোবেদার শরীলে আগুন ধরে দিয়া মারি ফ্যালে। ওমার আলাদা কোনো জাত নাই।'এই বেজাতি পুরুষতন্ত্র, ধান্ধাবাজ নারীবাদী, পঙ্গু সংবাদপত্র (মিডিয়া?), নোংরা সমাজপতি, অশ্লীল আইন, জঘন্য রাষ্ট্র, পকেটভারি এনজিও, আখের গোছানো স্বেচ্ছাসেবী, কিংবা বিকৃত মুক্তনারী... কেউই থামাতে পারে নি সাবিত্রী আর জোবেদার আর্তচিৎকার। পুড়েছে, মরেছে তবু পুরুষতান্ত্রিক সমাজকে দেখিয়ে দিয়েছে ক্ষতস্থানগুলো। কোনো সংঘ-সমিতি-আইন তাদের মৃত্যুকে ঠেকাতে পারে নি; এ যেন আঠারো শতকীয় অন্ধকারাচ্ছন্ন ভারতবর্ষ। গল্পকার দেখেছেন এবং লিখেছেন সেভাবেই। গল্প নয়, স্মৃতিদৃশ্যপট উন্মোচন করেছে সত্য ঘটনার এবং সমাজব্যবস্থার প্রতিই একটা বিবমিষা জাগিয়ে তুলেছে পাঠকের। দৃশ্যপট যখন আমাদেরই সমাজের একটা করুণ নোংরা ঘা-য়ের তখন শৈল্পিক গঠন হয়ে পড়ে গৌণ। তবে প্রতিবাদ নেই কেন কোথাও? তবে কি এ সমাজ নির্লিঙ্গদের আস্তাবল? হতে পারে। যে কারণে গল্পকার বলেন- `তথাপি এ কাহিনী শেষ হয় না' এবং একথাও সত্য বলে প্রতীতী জন্মায় যে-`রৈখিক ধ্বনির সব চিৎকার মৃত্যুর মতোই...'। তবে আসুন মিজান খন্দকার-এ সমাজটাকেই ছুঁড়ি ফেলি। জল আর কাদামাটির নতুন প্রতিমা দিয়ে গড়ে তুলি এক মানবিক কাব্যময় সমাজ।

সৃজন বর্ষ ১৭ সংখ্যা-১সেপ্টেম্বর ২০০৯
এ সংখ্যার সম্পাদক
ইউসুফ আলমগীর
মাইকেল রবিন সরকার

সম্পাদনা পরিষদ
আব্দুল খালেক ফারুক
আহসান হাবীব নীলু
ইউসুফ আলমগীর
মাহফুজুল ইসলাম শামীম
মাইকেল রবিন সরকার

সোমবার, ৭ সেপ্টেম্বর, ২০০৯

তরুণ লেখক ফোরামের প্রতিষ্ঠাবাষিকী

তরুণ লেখক ফোরামের প্রতিষ্ঠাবাষিকী উপলক্ষে সকলকে শুভেচ্ছ।
৬ সেপ্টেম্বর ১৯৯২ সালে প্রতিষ্ঠিত সংগঠন হাটি হাটি পা পা করে পার করলো ১৭ বছর।
এ উপলক্ষে কুড়িগ্রাম সাধারণ পাঠাগারে কবি-লেখকদের ছিল বিশেষ আড্ডা।
বেরিয়েছে `সৃজন'-এর নতুন সংখ্যা।
আড্ডা তুখর আলোচনা অংশ নেন কবি ও গীতিকার আব্দুল খালেক ফারুক,
কবি মাইকেল রবিন সরকার, গল্পকার আলমগীর কবীর বাবলু,
কবি ইউসুফ আলমগীর, আহসান হাবীব নীলু, জামল অন্তর, সাম্য রাইয়ানসহ আরও অনেকে।
তরুণ লেখক ফোরাম আগামী ২৯, ৩০ ও ৩১ অক্টোবর ২০০৯ কুড়িগ্রাম পৌরসভা চত্বরে
বইমেলা, লেখক সমাবেশ, কবিতা উৎসব, চলচ্চিত্র প্রদর্শন,
লেখালেখি কর্মশালা, ভাওয়াইয়া গানের অনুষ্ঠানসহ নানা আয়োজন করেছ।
সমস্ত আয়োজনে সাহিত্যপ্রমী সকলের আমন্ত্রন।
সে সময় সৃজন বর্ধিত কলেবরে বের হবে।
লেখা চাইছি।
লেখা পাঠান: tarunlekhokforum@ gmail.com

শুক্রবার, ২৮ আগস্ট, ২০০৯

`সৃজন`-এর কাজ চলছে

তরুণ লেখক ফোরামের নিয়মিত প্রকাশনা `সৃজন`-এর কাজ চলছে।
দুই একদিনের মধ্যে প্রকাশিত হবে।
চোখ রাখুন এই ব্লগে।
এছাড়াও সৃজন সংগ্রহ করতে চাইলে জানান এই নাম্বারে: ০১৭১২২৫০২০৫

মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট, ২০০৯

তরুণ লেখক ফোরাম-এর পথচলা

কুড়িগ্রামের লেখক ও কবিদের সংগঠন-
তরুণ লেখক ফোরাম
৬ সেপ্টেম্বর ১৯৯২ যে লক্ষ্য নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিল
শত প্রতিকূলতার মধ্যেও তাতে অবিচল থেকেছে।

স্থানীয় কবিদের লেখা নিয়ে পাঠচক্র,
আলোচনা-সমালোচনা, আবৃত্তি, সাহিত্য-সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা,
কবি সমাবেশ, লেখক সমাবেশ,
নবীন লেখক অণ্বেষণ, সাহিত্যপত্র প্রকাশসহ
নানা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে আসছে এই সংগঠন।